BDINFO.ORG

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > ফরহাদ মজহার > একাত্তর টিভিতে গনস্বাস্থ কেন্দ্রের মিডিয়া ট্রায়াল

একাত্তর টিভিতে গনস্বাস্থ কেন্দ্রের মিডিয়া ট্রায়াল

25 April 2020, by ফরহাদ মজহার

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশের স্বাস্থ্য আন্দোলনের ইতিহাসে পরিচিত নাম। এর জন্ম রণাঙ্গণে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ফিল্ড হাসপাতাল হিশাবে। উনিশ শ’ বিরাশি (১৯৮২) সালের ওষুধ নীতি প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ডাঃ জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী বাংলাদেশের জনগণকে শুধু ক্ষতিকর ও অকার্যকর ওষুধের হাত থেকে রক্ষা করবার নজির স্থাপন করেন নি, সারা পৃথিবীর মানুষ ওষুধ ও স্বাস্থ্য খাতে কিভাবে বহুজাতিক কোম্পানীর হাতে জিম্মি হয়ে থাকে সেটাও দেখিয়েছিলেন। বাংলাদেশ এখনো সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মীদের কাছে যুগান্তকারী ওষুধ নীতির জন্য বিখ্যাত। ওষুধ নীতি বাংলাদেশের ওষুধ খাতের বিকাশে প্রভূত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। আজ বাংলাদেশের ওষুধ খাতের যে বিকাশ আমরা দেখি তার কারণ খুঁজতে হলে বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে দেশীয় খাত বিকাশের ক্ষেত্রে ওষুধ নীতির বলিষ্ঠ ভূমিকা আমলে নীতি হবে ।

বাংলাদেশের জনগণের জন্য ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান নিয়ে আলাদা গবেষণা হতে পারে। কয়েক বছর আগে কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য তিনি যে গণস্বাস্থ্য ডায়ালাইসিস সেন্টার গড়ে তুলেছেন, তার জন্য সাধারণ মানুষ, যারা টাকার অভাবে ডায়ালাইসিস করাতে না পেরে মারা যেতো, আজ তারা সুলভে ডায়ালাইসিস করতে পারছেন। সাধারন মানুষের জন্য তাঁর কাজের অবদান অসামান্য।

সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবার প্রশ্নে ডাঃ জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরীর অবদান অস্বীকার করবার কোন সুযোগ নাই। তিনি অনন্য। অতএব তিনি যখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী দ্বারা উদ্ভাবিত ‘কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট” মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বানাবার ঘোষণা দিলেন, সারা দেশের মানুষ টান টান উত্তেজনা, আশা ও গর্বে তাঁর প্রতিশ্রুতি পালনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু এক শ্রেণির ওষুধ কোম্পানি, ব্যবসায়ী, ডাক্তার এবং আমলা এই ঘোষণাকে মহাবিপদ হিশাবে দেখল। কারণ কোভিড-১৯ কেন্দ্র করে মহাআতংক ছড়িয়ে ‘কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট” নিয়ে ব্যবসা ও লুটপাটের যে আশা তারা করেছিল, ডাঃ জাফরুল্লাহ তাদের গুড়ে বালি মিশিয়ে দিলেন। ফলে তারা দলে বলে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ওপর গোস্বা হয়েছেন। কারণ একটাই। জাফরুল্লাহ চৌধুরী যে কিট বানাবেন, তার দাম মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। আমরা দেখলাম, বলতে না বলতেই রাতারাতি ‘গণস্বাস্থ্যের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট-১৯’-এর বিরুদ্ধে লুটেরা ব্যবসায়ী শ্রেণী ও সরকারী আমলাদের স্বার্থের আঁতাত গড়ে উঠল। যে করেই হোক ‘গণস্বাস্থ্যের ‘কোভিড-১৯ শণাক্তকরণ’ কিট বানানো বন্ধ করতে হবে। শুরু হোল কাঁচামাল আমদানিতে নানান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দোহাই দিয়ে বাধা দেওয়া ও দেরি করা। এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। এ লড়াই আমরা এর আগেও দেখেছি।

কিন্তু করোনা মহামারীর কালে যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য, সেটা হোল একাত্তর টেলিভিশানের ‘বৈজ্ঞানিক আদালত’ বসানো। বৈজ্ঞানিক আদালত বসিয়ে মিডিয়া প্রচারণা দিয়ে প্রমাণ করা যে ‘গণস্বাস্থ্যের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট-১৯’ নিয়ে নাকি ‘সন্দেহ’ আছে। অর্থাৎ ‘সন্দেহ’ ট্যাগ লাগিয়ে গণস্বাস্থ্যের কীট বানানো ও ব্যবহারকে রুখে দেওয়া। বহুজাতিক কোম্পানি ও লোভী ব্যবসায়ীদের জন্য কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কীটের বাজার রক্ষা ও প্রমোট করা।

বৈজ্ঞানিক, নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যাক্তিক প্রক্রিয়ায় এবং সরকারের রেগুলেটরি অথরিটির মাধ্যমেই জাফরুল্লাহ্‌ শনাক্তকরণ কিট উৎপাদন ও সরবরাহ করতে চাইছেন। মনে রাখতে হবে কোভিড-১৯ মহামারী জাতীয় স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ইমার্জেন্সি। তাহলে আমলাদের উচিত এই কাজে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা তৈরি, বাধা দেওয়া কিম্বা এই জাতীয় উদ্যোগকে বন্ধ করা তো নয়ই, বরং যেখানে তারা যুক্তিসঙ্গত সমস্যা দেখছেন, তা সমাধানের জন্য জাতীয় দায়িত্ব হিশাবে ঝাঁপিয়ে পড়া। যেন আমরা দ্রুত কিট পেতে পারি। কিন্তু আশ্চর্য! আমরা সম্পূর্ণ উল্টাটা দেখছি। এখন দল বেঁধে একাত্তর টেলিভিশনে জাফরুল্লাহকে ‘অপরাধী’ বানানোর চেষ্টা হোল। অতিশয় জঘন্য এবং নিন্দনীয় কাজ।

‘গণস্বাস্থ্যের কোভিড-১৯ শনাক্তকরণ কিট-১৯’ সরকার অনুমতি দেবে কি দেবে না, সেটা কিটটির বিরুদ্ধে ‘সন্দেহ’ ছড়িয়ে একাত্তর টিভির বন্ধ করার চেষ্টার প্রতিবাদ সকলেরই করা উচিত। সাংবাদিকতার দিক থেকে দুই পক্ষের বক্তব্য হাজির করা অন্যায় কিছু নয়। শ্রোতা, দর্শক এবং নীতিনির্ধারকরা যার যার মতো করে বিশ্লেষণ করবে। কিন্তু যেটা সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার বিরোধী এবং মহামারীর বিপর্যয়ের বাস্তবতায় অতীব জঘন্য কাজ সেটা হোল গণস্বাস্থ্যের কোভিড ১৯ শনাক্তকরণ কিটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাংবাদিক নীতিনৈতিকতা নির্লজ্জ ভাবে বর্জন করা। যারা অনুষ্ঠান দেখেছে তাঁরা স্পষ্টই বুঝেছেন যে আজ কিটটি সরকারের কাছে জমা দেওয়ার আগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করাই একাত্তর টিভির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলনা। জাফরুল্লাহকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও হেয় করাও উদ্দেশ্য ছিল। একজন ব্যাক্তিকে আনা হয়েছে তিনি দাবি করেছেন, বিদ্যমান মহামারী আইন অনুসারে জাফরুল্লাহ ’অপরাধ’ করেছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দিয়ে কাঁচামাল আনা এবং থার্ড পার্টি ভেলিডেশানের নামে মহামারী মোকাবিলার জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা কিট আনা ইতোমধ্যেই নানান টালবাহানায় দেরি করা হয়েছে। এখন একাত্তর প্রমাণ করতে চাইছে গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে শুধু ‘সন্দেহ’ আছে তা না, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী অপরাধী।

গতকাল (২৪ এপ্রিলের মাঝরাত) একাত্তর টেলিভিশন ’আদালত’ বসালো। গণস্বাস্থ্যের কোভিড-১৯ শনাক্তের কিট ‘সন্দেহজনক’ রায় দিলো। আজ (২৫ এপ্রিল) দেখুন কি হয়েছে। আজ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কিট সরকারকে জমা দেবার কথা ছিল। কিন্তু যাঁরা যাবার তাঁরা যান নি। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘ওষুধ প্রশাসনের মহাপরিচালক (ডিজি) আমাকে জানিয়েছেন, আজকে তারা আসতে পারবেন না। জানি না, আজকে তারা কেন আসতে পারলেন না। মন্ত্রীকেও (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) আমরা তিন দিন আগে এই অনুষ্ঠানে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। উত্তর পাইনি। মন্ত্রী এখন অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। হতেই পারে। কারণে-অকারণে অনেক ব্যস্ত আছেন, লেনদেনের ব্যাপারও হয়তো আছে।’

জাফরুল্লাহ বলেছেন, ‘আমরা আর্মি প্যাথলজি ল্যাবরেটোরিকেও আমন্ত্রণ করেছিলাম। তারা অনুমতি পাননি বলে আসতে পারবেন না। আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চেয়ারম্যান ফোন করে আমাকে জানিয়েছেন, তিনি অসুস্থ, তাই আসতে পারলেন না।’

তবে সিডিসি এসেছে। জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাই বলেছেন, “আমাদেরকে সিডিসি কনফার্ম করেছিল আসবে, একমাত্র তারাই এসেছে। সিডিসিকেই আমরা দিয়ে দেব। বাকিদেরকে আমরা কালকে সরকারিভাবে প্রত্যেকের অফিসে পৌঁছে দেব। আমাদের দুঃখ, আপনাদের সামনে হস্তান্তর করতে পারছি না”।

আমরা দেখছি কিভাবে একটি শক্তি কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।

Updated: 25 April 2020