BDINFO.ORG

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > উপসম্পাদকীয় > এবিএম মুসা > ফাঁসি কেন হলো না, জানতে চাই

ফাঁসি কেন হলো না, জানতে চাই

8 February 2013, by এবিএম মুসা

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রকৃত অর্থে ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, গণহত্যা—এমনই অসংখ্য অপরাধের দায়ে জামায়াতের কাদের মোল্লার জেল হয়েছে। অতি সাধারণ একটি খুনের শাস্তির সংবাদ, যদি না এর সঙ্গে জড়িত থাকত ৩০ লাখ হত্যা, ১০ লাখ ধর্ষণ এবং আরও অবর্ণিত অমানুষিক অপরাধ। সাধারণ একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য যেখানে একজন নাগরিকের ফাঁসি হয়, যদি না ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ রাষ্ট্রপতির ক্ষমা লাভ করেন, সেখানে অসংখ্য নির্মম হত্যার জন্য শুধু জেল হলো—কয় বছর, সেটি অবান্তর। একাত্তরে যাঁরা স্বজন হারিয়েছেন, যাঁদের মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয়েছে, তাঁদের স্বজন আর উত্তরসূরিরা শুধু জেলের খবর শুনে চরম মাত্রায় ক্ষুব্ধ। তাঁদের মনোবেদনা, অন্তর্জ্বালা আর প্রতিবাদে-ক্রোধে উত্তাল ঢাকার তাহরির স্কয়ার শাহবাগ।

তিন দিন ধরে পত্রিকায় প্রকাশিত এই খবর পড়ে উদ্বেলিত হয়েছি, তেমনই হয়েছি উৎকণ্ঠিত। শয্যাশায়ী অবস্থায় তাঁদের ‘ফাঁসি চাই’ দাবিটির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে একাত্মতা প্রকাশ করেছি। অতঃপর ভাবছি, যাঁরা ‘ফাঁসি চাই’ বলে তিন দিন-তিন রাত শাহবাগ মোড় উত্তাল করেছেন, তাঁদের দাবিটি আমার কাছে (১) বিলম্বিত, (২) একমুখী আবেগপ্রসূত ও (৩) শুধু ফাঁসির দাবির প্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের দাবিটির অসারতা হচ্ছে, প্রকৃত দাবিটি ‘ফাঁসি চাই’-তে সীমাবদ্ধ কেন। এখন তো ফাঁসির ব্যাপারটি আইনি প্যাঁচে ‘হনুজ হরন্ত’। কাদের মোল্লাকে আইনের অথবা অন্য কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে বের করে এনে জীবিত রাখা হয়েছে। এখন লাখো কণ্ঠে সোচ্চার আওয়াজ উঠতে হবে, চিৎকার করে কৈফিয়ত চাইতে হবে, ‘ফাঁসি হলো না কেন?’
আমার এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনার সময় এক আইনজ্ঞ বন্ধু নানান আইনি যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, কোনো এক আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁক দিয়ে কাদের মোল্লা বেঁচে গেছেন। ওর সব বিজ্ঞ যুক্তির জবাব দেওয়ার আইনি ভাষা আমার নেই।

‘আইনের যেই ফাঁক’ দিয়ে কাদের মোল্লা বেঁচে গেছেন, সেটি কাদের করা, ফুটোটি কে বা কারা করেছে, সেটি জানতে চাই। তাই যদি হয়, শাহবাগের উদ্বেলিত জনতার কাছে আমার দাবি, তোমরা ফাঁসি চাই আওয়াজ নয়, যারা আইনের ফাঁক খোলা রেখে কাদের মোল্লাকে বাঁচিয়ে দিল, তাদের ফাঁসি চাও। বাঁচানেওয়ালারা যখন তোমাদের সমাবেশে এসে কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ করে, তখনো কি তোমরা ঢাক-বাজনা বাজাবে? টেলিভিশনে এই মোকাবিলার ছবি দেখে আমি অবাক হয়েছি। এই ফাঁসি দেওয়া না-দেওয়া কি শুধু বৈচারিক মানদণ্ডে ওজন করতে হবে? এর কি কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নেই? জঘন্য ক্ষমতার রাজনীতিতে এর কি কোনো অবস্থান নেই, মাজেজা নেই?

গতকাল প্রথম আলোতে আসিফ নজরুল আর মিজানুর রহমান খানের বিচার ও ফাঁসি হওয়া না-হওয়া নিয়ে দুটি প্রবন্ধ পড়ে কিছু আইনি জ্ঞান সঞ্চয় করেছি। আমার দুজন স্নেহভাজন কিছু মনে করবেন না, তাঁদের লেখা দুটি পড়ে আমার কেন জানি স্থূল কৈফিয়ত ব্যাখ্যায় আইনি কচকচি মনে হয়েছে। শাহবাগ মোড়ে যাঁরা তিন দিন-তিন রাত আবেগ ও ক্ষোভের ঝড় তুলছেন, তাঁরা আইনি ব্যাখ্যার জটিলতা বোঝেন না। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর একটি প্রতিবেদন আর একুশে টেলিভিশনে ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ এবং মৌলবাদী প্রশ্ন তাঁদের কাছে অধিকতর সহজবোধ্যও মনে হয়েছে। বলা যায়, এই দুটি প্রতিবেদনে তাঁদের বিশ্বাসটি দৃঢ়বদ্ধ হয়েছে, ফাঁসি হয়নি নয়, দেওয়া হয়নি।

বস্তুত ফাঁসি দেওয়া হবে না—সেই আভাসটি জনগণ সেদিনই পেয়েছে, যেদিন পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জামায়াত-শিবিরের পিটুনি খেয়েছে। একই দিন একই সময়ে এক রাস্তায় পুলিশ গড়াগড়ি দিচ্ছে, আরেক রাস্তায় তারা রজনীগন্ধা ফুল নিচ্ছে। যে পুলিশ বিএনপির নেতা-কর্মীদের পুরানা পল্টন থেকে বেরোতে দেয় না, তারাই পাহারা দিয়ে, মনে হচ্ছিল দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিচ্ছে। আমার যেন মনে হচ্ছিল, পুলিশ বলছে, ‘ওরা আমাদেরই লোক, আমাদের মুরব্বিদের প্রিয়ভাজন।’
এই মিছিল, শিবিরকে তোয়াজ আর নিষ্ক্রিয়তা দেখে তখনই কি আন্দাজ করা যায়নি খুন-ধর্ষণকারীর বিচারের রায় কী হবে?
আরও কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারি, যদিও ভাবছি এতে ‘আদালত অবমাননার’ দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে কি না। বিচার ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া আলোচনা করা যাক। আমাদের দেশে কি বিখ্যাত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিজ্ঞ আইনজীবীর অভাব ছিল? তাঁদের দু-একজন পাশ্চাত্যে আইনি লড়াই করতে যান। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় দিয়েছেন এমন বিচক্ষণ বিচারকের অভাব ছিল?

মরহুম সিরাজুল হক আর তাঁর সুযোগ্য পুত্র আনিসুল হকের অথবা সেই মামলার অতি-নিষ্ঠাবান আখন্দের মতো তদন্তকারী ছিল না? একজন বিচারককে কেন সুদূর পশ্চিমে পরামর্শ চেয়ে টেলিফোন করতে হলো। মজার ব্যাপার হলো, আজকে বিচারের রায়ে শাহবাগে হাজিরা দিয়ে বিশেষ মহলের যাঁরা চোখে লেবুর রস দিয়ে পানি ফেলছেন, তাঁরা সেই বিচারককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন বলে মনে হয়। এই টেলিফোন কথোপকথনের দায়ে বিচারক সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে হাজির হওয়ার মতো নীতিবহির্ভূত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি না, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে সেই প্রশ্নের জবাব দিতে পারলাম না।

বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর প্রতিবেদনে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার ক্ষেত্রে মামলা পরিচালনার তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সন্দেহটি প্রকাশ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল। তিনি এমনটিও বলেছেন, ‘প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার সদস্যদের যোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, সেসব আমলে নেওয়া হয়নি।’ যদি তা-ই হয়, দুটি প্রশ্ন করা যায়: ১. কেন আমলে নেওয়া হয়নি। ২. কারা আমলে নেননি। প্রশ্ন দুটি করলে স্বভাবতই সদ্য সম্পন্ন বৈচারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে হীন দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য উঁকি মারবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান চলমান জটিল ক্ষমতার রাজনীতির আদি-অন্তে যেতে হবে। এই সংশ্লিষ্টতায় ফাঁসি নিয়ে যে গুঞ্জনটি উঠেছে তা হলো, কার সঙ্গে কে মৈত্রীবন্ধনের কৌশল অবলম্বন করেছেন এবং কেন? এই গুজবের ডালপালাগুলো কত দূর বিস্তার লাভ করবে, তা আগামী কয়েক মাসে বোঝা যাবে।

একুশের টক শোতে ইফতেখারুজ্জামান আরেকটু খোলামেলা কথা বলেছেন, ‘সরষের মধ্যে ভূত আছে কি না।’ সরষেটি কোথায় আর ভূতটি কে, তার মধ্যে রায়-পরবর্তী পথেঘাটে আলোচনা, সাধারণ মানুষের কথাবার্তায়ই আভাস পাওয়া যাবে। তবে এমন অনেক বিষয়ে চার বছর তো অনেক সরষের ভূত দেখা গেছে, কিন্তু যেহেতু ওঝাই ভূত, তাই সরষেটি বহাল তবিয়তে আছে। কারণ, ইফতেখারুজ্জামানের সরষের মধ্যে রাজনৈতিক এজেন্ডা আছে কি না, সেই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামানকে সরাসরি বলছি, ‘আমার বদ্ধ ধারণা, মোল্লার বিচারের রায়ে নীচ রাজনৈতিক কূটকৌশল অবশ্যই ছিল।’ আমি কিন্তু বিচারকদের এই এজেন্ডা কার্যকর করার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা আছে, তা বলছি না। আমি জানতে চাই, এই কূটকৌশলে আগামী নির্বাচনে ‘জামায়াত’কে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কতটা খেলছে। অথবা জামায়াত কাকে খেলাচ্ছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যে নানা বক্তব্য এসেছে দুই মহল থেকে।

এক মহল বলছে, মোল্লার ফাঁসি নিয়ে বিএনপির কোনো বক্তব্য নেই কেন? এ ব্যাপারে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা ব্যাপক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেসবের মূল কথা হচ্ছে: ১. যায় শত্রু পরে পরে। এই কূটকৌশলে দ্বিতীয় যে কথাটি নেতা বললেন, তা আরও মজাদার। ‘আমরা বুঝতে পারছি, গত চার বছরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সম্পর্কে যে ঘৃণা ও ক্ষোভ আওয়ামী লীগ সরকার ও সমর্থকগণ নবীন ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রোথিত করেছেন, জামায়াতের সঙ্গে বোঝাপড়া করলে আওয়ামী লীগের জন্য তা বুমেরাং হবে। অপরদিকে বিএনপির একজন সচেতন নেতা বলেছেন, ‘আমরা এর সুযোগ নিতে সিন্দাবাদের বোঝাটি অনেকটাই ঝেড়ে ফেলতে চাই। কারণ, আওয়ামী লীগের সমর্থক, সচেতন সুশীল সমাজ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে একটি মেসেজ (সংকেত) আমাদের পাঠিয়েছেন, জামায়াতকে ছাড়ুন, অথবা তারা আপনাদের কাঁধ থেকে নামুক।’

বুঝতে হবে, সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলে বিএনপি-আওয়ামী লীগের বাইরে গত এক দশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ যে ৩০ শতাংশ ভোটার আছেন, তাঁরা আপনাদের দিকে মুখ ফেরাবেন। প্রশ্ন করেছিলাম, এমনটি হবে কি? তিনি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ‘কাদের মোল্লার বিচারের রায়ের প্রতিক্রিয়া থেকে কি এমন কোনো আভাস পাচ্ছেন না? বাকি রায়গুলোর জন্য অপেক্ষা করুন।’ এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের উভয় সংকট। বাকিদের ফাঁসি দেওয়ার পর জামায়াতকে খেপিয়ে দিলে ক্ষুরের মোকাবিলা চাপাতি দিয়ে করা যাবে না।

আর জামায়াতের সঙ্গে বৈচারিক আপস করলে সারা বাংলা হবে তাহরির স্কয়ার। তখন নিজেদের তদারকিতেই হোক আর তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হোক। আগামী নির্বাচনের রায় নিশ্চিতভাবেই তাদের বিপক্ষে যাবে।

ব্যাখ্যা হচ্ছে, শাহবাগের লাখো মানুষের গণজমায়েত সেই রায়টি অনিশ্চিত করে দিয়েছে। সেটাকে নিশ্চিত করার জন্যই আমি শাহবাগের উদ্বেলিত তরুণ-কিশোর ও আবাল-বৃদ্ধ-জনতাকে বলছি, এখন আওয়াজ তুলুন, ‘মোল্লার ফাঁসি কেন হলো না? কার সঙ্গে কার আঁতাত হচ্ছে—জানতে চাই।’ তাহলে ইফতেখারুজ্জামান যাদের সরষের ভূত বলেছেন, তাদের ঘাড়ে ওঝার ঝাঁটার বাড়ি পড়বে। মানবতাবিরোধী অন্যান্য অপরাধের আসন্ন বিচারে নেপথ্য রাজনৈতিক চালবাজি বন্ধ হবে।

এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

(প্রথম আলো, ০৮/০২/২০১৩)

Updated: 10 July 2020