BDINFO.ORG

নতুন দৃষ্টিতে বাংলাদেশ

প্রথম পাতা > নির্বাচিত প্রবন্ধ > ভেতর থেকে দেখা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

ভেতর থেকে দেখা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান

25 January 2021, by চপল বাশার

বাংলাদেশে ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচারের প্রচলন এতবেশি হয়েছে, প্রপাগান্ডাবাজরা এখন স্ববিরোধী কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেননা। আজকে ২৫শে জানুয়ারি কুখ্যাত বাকশাল দিবস সম্পুর্ণভাবে চেপে গিয়ে দৈনিক যুগান্তর প্রকাশ করেছে উনসত্তরের গনঅভ্যুত্থান সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ। ইতিহাস বলে এই সময়ে প্রেসিডেন্ট আয়ুবের পতন হয়েছিল পশ্চিমপাকিস্তানিদের কঠোর আন্দোলন আর ইয়াহিয়ার কুদেতার কারনে। অথচ আমাদের প্রপাগান্ডাবাজরা দাবি করে সেটা না কি শেখমুজিবের নামে গনঅভ্যুত্থান। তাদের দাবি চিত্রিত করতে যে ছবি ব্যাবহার করা হয় তাদেখেই নতুন প্রজন্ম ঠাহর করতে পারবে এদের দাবি কতটুকু সত্য। দশ বিশ জনের মিছিল দিয়ে যা হয়েছে তাকে গনঅভ্যুর্ত্থান নয় বরং আধুনিক ভাষায় বলে রঙ্গিনবীপ্লব (color revolution)। #BDINFO

ঊনসত্তরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। দশ সদস্যবিশিষ্ট সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পরপরই তারা ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করেন। এ ১১ দফায় ছাত্রদের দাবি-দাওয়া ছাড়াও ছিল জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কিত দাবি। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবিও এ ১১ দফার অন্তর্ভুক্ত হয়। কাজেই ১১ দফা শুধু ছাত্রদের নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির দাবিতে পরিণত হয়। আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় সমগ্র জাতি।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তখন বেগবান, যার ফলে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনও জোরদার হয়ে ওঠে। নেতৃত্ব তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাতে। ২০ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিশাল এক মিছিল শহীদ মিনার হয়ে মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে পূর্বদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। মিছিলের সামনে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান।

পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। একজন পুলিশ অফিসার রিভলভার দিয়ে আসাদুজ্জামানের বুকে গুলি করেন। এ সময় আরও অনেকেই আহত হন। ছাত্ররা ধরাধরি করে আসাদকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো যায়নি। সন্ধ্যায় তার জানাজা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। তার মরদেহ হাসপাতালের ভেতরেই একটি ঘরে রাখা হয়েছিল। পুলিশ রাতেই লাশটি ছিনতাই করে নিয়ে যায়।

আসাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৪ জানুয়ারি সারা দেশে পূর্ণদিবস হরতাল আহ্বান করে। হরতালের আগে ২১ থেকে ২৩ জানুয়ারি বিভিন্ন কর্মসূচি ছিল। সে সময়ে দেখা যায়, হরতালের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। ২৪ জানুয়ারি ঢাকায় সকাল-সন্ধ্যা সফল হরতাল পালিত হয়। সেদিনের কিছু কথা এখানে বলতে চাই।

জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হলাম, এক সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠনের সদস্য হলাম। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮, দুই বছর আমি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এ কারণে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ছাত্রদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আমার বাসা গোপীবাগে।

এ এলাকার শিক্ষার্থীরা কম-বেশি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে আমার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হলো মতিঝিলে যেন হরতাল ভালোভাবে হয়। আমি আমার এলাকার ছাত্র-যুবকদের নিয়ে স্থানীয়ভাবে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করলাম এবং হরতালের পক্ষে প্রচার চালাতে লাগলাম। মতিঝিল তখন বিরাট বাণিজ্যিক এলাকা এবং এখনো তাই। সেখানে তখন শতাধিক সরকারি-বেসরকারি অফিস। আমরা সব ভবন ও অফিসে গেলাম এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হরতালে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালাম। তাদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেলাম।

২৪ জানুয়ারি হরতালের দিন সকাল ৮টায় আমরা ছাত্র-যুবকরা গোপীবাগ মোড়ে সমবেত হলাম। আমাদের হাতে কিছু ফেস্টুন ও একটা ব্যানার ছিল। আমাদের সংখ্যা যখন ৪০-৫০ হলো, তখন স্লোগান দিতে দিতে উত্তরদিকে অগ্রসর হলাম। আমরা প্রথমেই গেলাম ওয়াপদা ভবনের গেটে। দেখলাম গেটে বিরাট একটা তালা ভেতরের দিক থেকে। বিরাট লোহার গেট, খুব মজবুত। কর্তৃপক্ষ ভেতর থেকে তালা দিয়েছে যাতে বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে না পারে, ভেতর থেকেও কেউ বেরোতে না পারে। আমরা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকলাম।

ভেতরে অবরুদ্ধ কয়েকশ কর্মচারীও আমাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে স্লোগান দিতে থাকলেন। কিন্তু গেট খোলা হলো না। গেটের বাইরে তখন আমাদের সঙ্গে কয়েকশ’ লোক যোগ দিয়েছে। এক সময় উত্তেজিত জনতা তালাবদ্ধ গেটে ধাক্কা দিতে শুরু করল। চেষ্টা করল গেটটা ভেঙে ফেলতে। ঠিক সেই সময় ওয়াপদার চেয়ারম্যান মাদানি সাহেব উপর থেকে নেমে গেটে দাঁড়ালেন। তার মধ্যে কোনো উত্তেজনা দেখলাম না।

তিনি শান্তভাবে ইংরেজিতে আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কী চাও?’ আমি জবাব দিলাম, ‘আজ হরতাল। গেট খুলে দিন, ওদের বাইরে আসতে দিন।’ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, গেট খুলে দিচ্ছি। যারা যেতে চায় বাইরে যাবে। কিন্তু তোমরা কেউ ভেতরে ঢুকবে না।’

তা-ই হলো, গেট খুলে দেওয়া হলো। ভেতর থেকে স্রোতের মতো ওয়াপদার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাইরে বেরিয়ে এলেন স্লোগান দিতে দিতে। লোকসংখ্যা তখন হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মিছিল এগিয়ে চলল উত্তরদিকে, এখন যেখানে শাপলা চত্বর, সেদিকে। রাস্তার দুপাশের সব ভবন ও অফিস থেকে তখন লোকজন দল বেঁধে নেমে আসছে, মিছিলে যোগ দিচ্ছে।

মিছিলের সামনে তখনো আমি ও আমার বন্ধুরা। শাপলা চত্বরের ওখান থেকে মিছিল আমরা বাম দিকে ঘুরিয়ে দিলাম, উদ্দেশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইকবাল হলে যাব। ইকবাল হল এখন জহুরুল হক হল। ওটাই ছিল আন্দোলনের কেন্দ্র, সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ওখানেই থাকতেন।

মতিঝিল এলাকার মাঝামাঝি আসতেই মিছিলের আকার এত বড় হয়ে গেল যে, আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। আমি ছিলাম মিছিলের সামনে, এক সময় ছিটকে পড়লাম একপাশে। আমাদের নেতৃত্ব তখন নেই, জনতার হাতে চলে গেছে। আমরাও তো তাই চাইছিলাম-জনতা আন্দোলনে থাকুক। কেননা জনতা কখনো ভুল করে না। তখন প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। শহরের অন্যান্য এলাকা থেকেও মিছিল যাচ্ছে ইকবাল হলের দিকে। মিছিলগুলোর প্রধান স্লোগান ছিল-‘আইয়ুব শাহী ধ্বংস হোক।’

আমাদের মতিঝিল এলাকার মিছিলটিই ছিল সবচেয়ে বড়। এর একটি অংশ জিপিওর সামনে দিয়ে সচিবালয়ের রাস্তায় অগ্রসর হতে থাকে। মিছিলের লক্ষ্য কিন্তু সচিবালয় ছিল না, তারা ওই রাস্তা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশ ও ইপিআর বাধা দিলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। গুলি চালানো হয় মিছিলে। সেখানেই স্কুলছাত্র মতিউর রহমান মল্লিকের বুকে গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

বিক্ষুব্ধ জনতা মতিউরের মরদেহ নিয়ে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে ইকবাল হলের মাঠে গিয়ে পৌঁছায়। বিরাট মাঠটি তখন লাখো জনতায় পরিপূর্ণ। সেখানে একটা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল আগেই। কথা ছিল জনসভা হবে। সেই মঞ্চেই মতিউরের মরদেহ রাখা হলো। মঞ্চে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারাও ছিলেন। এক সময় মতিউরের বাবা আজাহার আলি মল্লিকও মঞ্চে এলেন।

পনেরো বছর বয়সি মতিউর রহমান মল্লিক ছিল বকশীবাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা আজাহার আলি মল্লিক ছিলেন তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মচারী। সেই সূত্রে তিনি মতিঝিলের ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনিতে (পরে সোনালী ব্যাংক কলোনি) একটা বাসা পেয়েছিলেন। মতিউর ওই ব্যাংক কলোনির বাসায় থেকেই স্কুলে পড়াশোনা করত।

সোনালী ব্যাংক কলোনি গোপীবাগ এলাকার মধ্যে পড়ে। কলোনিতে আমার কয়েকজন বন্ধুও থাকতেন। সে কারণে সেখানে আমার যাতায়াত ছিল। মতিউরকে আমি সেখানে দেখেছি। পাতলা ছিপছিপে, সুন্দর ফর্সা চেহারা। এ শান্ত ছেলেটিই যে এত সাহসী তা আগে বুঝতে পারিনি। সে মিছিলের শুরু থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিল। শেষ পর্যন্ত সচিবালয়ের কাছে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিল, শহীদ হলো।

ইকবাল হলের মাঠে যখন মতিউরের লাশ আনা হলো, তখন মাঠে লক্ষাধিক জনতা। উত্তেজনা তখন চরমে, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত মাঠ। ছাত্রনেতারা মাইকে বক্তব্য দিচ্ছেন, জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। মতিউরের বাবা আজাহার আলি মল্লিককে মঞ্চে এনে জনতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। লম্বা ছিপছিপে মানুষটি শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন। তাকে কিছু বলতে বলা হলো। তিনি বললেন, ‘আমি আমার সন্তান মতিউরকে হারিয়েছি; কিন্তু তার বদলে লক্ষ মতিউরকে পেয়েছি।’

জনসভা শেষে মতিউরের মরদেহ নিয়ে মিছিল বের হলো। মিছিলে উত্তেজিত জনতা, সারা শহরে উত্তেজনা। মিছিলের একটি অংশ মতিউরের মরদেহ নিয়ে সোনালী ব্যাংক কলোনিতে পৌঁছাল সন্ধ্যা নাগাদ। সেখানেও অনেক মানুষের ভিড়। বিকালের দিক থেকেই উত্তেজিত জনতা বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও মুসলিম লীগ নেতাদের বাড়িতে আক্রমণ চালাতে লাগল। সে সময়ের সরকারি পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ অফিস ভবনে আগুন দেওয়া হয়।

সচিবালয়ের সামনের রাস্তায় পশ্চিম প্রান্তে একজন মন্ত্রীর বাসা ছিল, সেটাতেও আগুন লাগানো হয়। পুরানা পল্টনে মর্নিং নিউজ অফিসের বিপরীত দিকে ছিল মুসলিম লীগ নেতা লস্করের বাসভবন। সেই বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়। শাহবাগে মুসলিম লীগ নেতা খাজা হাসান আসকারির বাড়িও আক্রান্ত হয়। ঢাকা শহরের অন্যান্য স্থানেও মুসলিম লীগ অফিস ও নেতাদের বাড়িতে হামলা হয়, আগুন দেওয়া হয়। এমনই পরিস্থিতিতে সারা শহরে কারফিউ জারি করে সরকার। পাশাপাশি সেনাবাহিনী নামানো হয়।

আমরা সন্ধ্যায় সোনালী ব্যাংক কলোনিতে জড়ো হলাম। মতিউরের মরদেহ তখন ওখানে। আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম, কখন আবার পুলিশ-মিলিটারি এসে মরদেহ ছিনতাই করে নিয়ে যায়। সিদ্ধান্ত হলো পুলিশ-মিলিটারি আসার আগেই মরদেহ দাফন করতে হবে, দেরি করা যাবে না। সেখানে সে সময়ে কোনো রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা বা কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কোনো সদস্য উপস্থিত থাকতে পারেননি কারফিউর কারণে।

আমরা স্থানীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও পাড়ার মুরব্বিরা মতিউরের বাবা আজহার আলি মল্লিকের সঙ্গে কথা বললাম। ঠিক হলো মতিউরের মরদেহ গোপীবাগ কবরস্থানে রাতেই দাফন করা হবে। মরদেহ গোসল করানো হলো, কাফনের কাপড় পরানো হলো, জানাজা হলো কলোনির মাঠেই। বাইরে রাস্তায় পুলিশ-ইপিআর-মিলিটারি টহল দিচ্ছে, গুলির শব্দও পাওয়া যাচ্ছে।

গোপীবাগের কবরস্থান রামকৃষ্ণ মিশন রোডের পাশে একটি গলির ভেতরে। কবরস্থানটি রামকৃষ্ণ মিশন মঠের পূর্বদিকে। মরদেহ রাস্তা দিয়ে নেওয়া যাবে না, সেখানে পুলিশ-মিলিটারি থাকার আশঙ্কা। আমরা মতিউরের মরদেহ নিয়ে কলোনির দক্ষিণ দিকের একটি বাড়িতে পেছন দিক দিয়ে ঢুকলাম। বাড়ির মালিক-বাসিন্দারা আমাদের সাহায্য করলেন। কবরস্থানের গলিতে ঢুকতে হলে মিশন রোড অতিক্রম করতে হবে। রাস্তায় সে সময়ে পুলিশের টহল চলছে। আমরা অপেক্ষা করলাম।

এক সময় পুলিশের টহল থামলে আমরা দ্রুত রাস্তা অতিক্রম করে কবরস্থানের গলিতে ঢুকে পড়লাম। কবরস্থানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মরদেহ দাফন করা হলো। একটু নিশ্চিন্ত হলাম। আসাদের মরদেহ ছিনতাই হয়ে গেছে, মতিউরের মরদেহ ছিনতাই হতে দিলাম না। মতিউরকে দাফনের পর সবার সঙ্গে আমিও কবরে তিনবার মাটি দিলাম। বুকের মধ্যে শুধু শোকের যন্ত্রণা। শোককে শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছি।

দুঃখের বিষয়, মতিউরের কবর আমরা সংরক্ষণ করতে পারিনি। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর তার কবরের ওপর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তিনজনকে কবর দেওয়া হয়েছে। মতিউরের কবর সংরক্ষিত না হলেও তার স্মৃতি আমাদের মনে সংরক্ষিত আছে।

বর্তমান সরকার ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আসাদুজ্জামান ও শহীদ মতিউর রহমান মল্লিককে ২০১৮ সালের স্বাধীনতা পদক দিয়ে সম্মানিত করেছে। এতে আমরা সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ। শহীদ হওয়ার প্রায় ৫০ বছর পর তারা তাদের যোগ্য সম্মান পেয়েছেন। আমরা আশা করবো, বাংলাদেশের গণআন্দোলনের সব শহীদই সম্মানিত হবেন।

চপল বাশার : সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা


স্মৃতির পাতায় ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো


প্রতি বছর বাঙালি জাতির জীবনে যখন জানুয়ারি মাস ফিরে আসে, তখন ’৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলো স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে উজ্জ্বলতম দিন আছে। আমার জীবনেও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা আছে।

‘ঊনসত্তর’ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কালপর্ব। আইয়ুবের লৌহ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ’৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তের কথা মনে পড়ে। অনেক সময় ভাবি, কী করে এটি সম্ভব হয়েছিল!

’৬৬-’৬৭তে আমি ইকবাল হল ছাত্রসংসদের সহ-সভাপতি এবং ’৬৭-’৬৮তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসুর সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূতিকাগার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ’৬০-এর দশকের গুরুত্ব অনন্য। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ’৪৮ ও ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬ দফা ও ’৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা দিয়েছিলেন আমি তখন ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সহ-সভাপতি। ইকবাল হলের সহ-সভাপতির কক্ষ ছিল ৩১৩ নম্বর। এ কক্ষে প্রায়ই অবস্থান করতেন শ্রদ্ধেয় নেতা সর্বজনাব শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান এবং আবদুর রাজ্জাক। ৬ দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু দেশব্যাপী ঝটিকা সফরে ৩৫ দিনে ৩২টি জনসভা করেন এবং বিভিন্ন জেলায় বারবার গ্রেফতার হন।

বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দেওয়ার পর আমাদের বলেছিলেন, ‘সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ অর্থাৎ এ ৬ দফার সিঁড়ি বেয়ে তিনি স্বাধীনতায় পৌঁছবেন। বিচক্ষণ নেতা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাজনীতি করেছেন। স্বাধীনতার লক্ষ্য সামনে নিয়েই ’৪৮-এ ছাত্রলীগ, ’৪৯-এ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করে ৬ দফায় তা প্রতিফলিত করেন।

৬ দফা দেওয়ার পর আইয়ুব-মোনায়েমের নির্দেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় বঙ্গবন্ধুর নামে ১০টি মামলা করা হয়। প্রতিটি মামলায় জামিন পেলেও দেশরক্ষা আইনে তাকে কারাবন্দি করা হয়। শেষবার নারায়ণগঞ্জ থেকে সভা করে ঢাকা আসার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের ডাকে ৭ জুন দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালে ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

’৬৮-এর ১৮ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পেলেও আবারও জেলগেট থেকেই গ্রেফতার করে আগরতলা মামলার ১ নম্বর আসামি হিসাবে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে আমরা জানতাম না প্রিয়নেতা কোথায়, কেমন আছেন। আমরা ছাত্রসমাজ এ গ্রেফতারের বিরুদ্ধে তুমুল গণআন্দোলন গড়ে তুলি। পরে তা আরও তীব্রতর হয়। ’৬৮-এর ১৯ জুন আগরতলা মামলার বিচার যখন শুরু হয়, সেদিন থেকেই আমরা জানতাম আইয়ুব খান রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দেবে। আইয়ুব খান প্রদত্ত মামলার নামই ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য।’

স্মৃতিকথা লিখতে বসে মনে পড়ছে, ডাকসুসহ ৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ১১ দফার ভিত্তিতে ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠার কথা। মনে পড়ে ১১ দফা আন্দোলনের প্রণেতা-ছাত্রলীগ সভাপতি প্রয়াত আবদুর রউফ ও সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী; ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) সভাপতি প্রয়াত সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক ও সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা; ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল্লাহ; এবং এনএসএফ-এর একাংশের সভাপতি প্রয়াত ইব্রাহিম খলিল ও সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম মুন্সীর কথা। এ ছাত্রনেতাদের প্রত্যেকেই ছিলেন খ্যাতিমান।

আমি ডাকসুর ভিপি হিসাবে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করি। আমার সঙ্গে ছিলেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরী। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বটতলায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১১ দফা প্রণয়নের পর এটাই প্রথম কর্মসূচি। এর আগে আমরা ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছি।

১৭ জানুয়ারি মাত্র শ’পাঁচেক ছাত্র বটতলায় জমায়েত হয়েছিল। ডাকসুর ভিপি হিসাবে আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গভর্নর মোনায়েম খান ১৪৪ ধারা জারি করেছে। সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব ছিল সিদ্ধান্ত দেওয়ার ১৪৪ ধারা ভাঙব কী ভাঙব না। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এমনকি গুলিও চলতে পারে, গ্রেফতার তো আছেই।

জমায়েতে উপস্থিত ছাত্রদের চোখে-মুখে ছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দৃঢ়তা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে শ’পাঁচেক ছাত্র নিয়ে রাজপথে এলাম। পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বেপরোয়া লাঠিচার্জ করে। আমরাও সাধ্যমতো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করি। শুরু হয় কাঁদানে গ্যাস আর ফায়ারিং। ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রউফ ঘটনাস্থলেই আহত হন। আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। পরদিন ১৮ জানুয়ারি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি দেই।

১৮ জানুয়ারি বটতলায় জমায়েত। যথারীতি আমি সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ছিল বিধায় সকালে বটতলায় ছাত্র জমায়েতের পর খণ্ড খণ্ড মিছিল এবং সহস্র কণ্ঠের উচ্চারণ-‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই।’ গতকালের চেয়ে আজকের সমাবেশ বড়। সেদিনও ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজপথে নেমে এলাম। দাঙ্গা পুলিশ বেধড়ক লাঠিচার্জ আর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করল। ফিরে এলাম ক্যাম্পাসে।

পরদিন ছিল রবিবার। সে সময় রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকত; কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল। কর্মসূচি নেওয়া হলো ১৯ জানুয়ারি, আমরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল করব এবং ১৪৪ ধারা ভাঙব। আমরা মিছিল শুরু করি। শুরু হয় পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ। কিন্তু কিছুই মানছে না ছাত্ররা। শঙ্কাহীন প্রতিটি ছাত্রের মুখ। গত দুদিনের চেয়ে মিছিল আরও বড়। পুলিশ গুলি চালাল। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রলীগের কর্মী আসাদুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে রাজপথে। বাড়ি দিনাজপুর। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

পুলিশের বর্বরতা ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ জানুয়ারি সোমবার আবার বটতলায় সমাবেশের কর্মসূচি দেই। ২০ জানুয়ারি ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের মাইলফলক। এদিন ১১ দফার দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। সভাপতির আসন থেকে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার পরিসর সমাবেশের তুলনায় ছোট। তিন দিনে আমরা সাধারণ ছাত্র ও বিপুলসংখ্যক জনসাধারণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছি। যখন সভাপতির ভাষণ দিচ্ছি, তখন মিল-কারখানা, অফিস-আদালত থেকে দলে দলে মানুষ আসছে বটতলা প্রাঙ্গণে।

সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে সভাপতির ভাষণে সেদিন বলেছিলাম, ‘যতদিন আগরতলা মামলার ষাড়যন্ত্রিক কার্যকলাপ ধ্বংস করে প্রিয়নেতা শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্ত করতে না পারব, ততদিন আন্দোলন চলবে। স্বৈরশাসক আইয়ুব-মোনায়েমশাহীর পতন না ঘটিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ঘরে ফিরবে না।’

পুনরায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা দিলাম। লক্ষ মানুষের মিছিল নেমে এলো রাজপথে। কোথায় গেল ১৪৪ ধারা! আমরা ছিলাম মিছিলের মাঝখানে। মিছিল যখন আগের কলা ভবন, বর্তমান মেডিকেল কলেজের সামনে, ঠিক তখনই গুলি শুরু হয়। আমি, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী ও আসাদুজ্জামান একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের লক্ষ্য করে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর গুলি ছোড়ে। গুলি লাগে আসাদুজ্জামানের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে আসাদ। আসাদকে ধরাধরি করে মেডিকেল কলেজের দিকে নেওয়ার পথে আমাদের হাতের ওপরই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

একজন শহীদের শেষ নিঃশ্বাস স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। মৃত্যু এত কাছে হাতের ওপর! মেডিকেলের সিঁড়িতে আসাদের লাশ রাখা হলো। তার গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শার্টটি সংগ্রামের পতাকা করে আসাদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করে সমস্বরে আমরা বলি, ‘আসাদ তুমি চলে গেছো। তুমি আর ফিরে আসবে না আমাদের কাছে। তোমার রক্ত ছুঁয়ে শপথ করছি, আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’

এরপর ছুটে গেলাম শহীদ মিনার চত্বরে। আসাদের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করলাম শোকার্ত জনতার মাঝে। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট সামনে রেখে সমাবেশের উদ্দেশে বললাম, ‘আসাদের এই রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেবো না’ এবং ২১ জানুয়ারি পল্টনে আসাদের গায়েবানা জানাজা ও ১২টা পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করি। আমাদের সত্তা ও অস্তিত্ব আসাদের রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। শহীদ মিনার থেকে শুরু হলো শোক মিছিল।

শোক মিছিল মুহূর্তেই লক্ষ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পরিণত হলো। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। শোক মিছিলের সম্মুখভাগ যখন তিন নেতার সমাধিসৌধের কাছে তখন সেনাসদস্যরা মাইকে বলছে, ‘ডোন্ট ক্রস, ডেঞ্জার-ডেঞ্জার, ডোন্ট ক্রস!’ কিন্তু শোক মিছিল শোকে আর ক্ষোভে উত্তাল। ‘ডেঞ্জার’ শব্দের কোনো মূল্যই নেই সেই মিছিলের কাছে। মিছিল থামল না, নির্ভয়ে এগিয়ে গেল। ২১ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত হরতাল কর্মসূচি সফলভাবে পালিত হলো।

এরপর চারদিক থেকে স্রোতের মতো মানুষের ঢল নামল পল্টন ময়দানে। মাইক, মঞ্চ কিছুই ছিল না। পল্টনে চারাগাছের ইটের বেষ্টনীর ওপর দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে হলো। বক্তৃতার পর ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করি : ২২ জানুয়ারি শোক মিছিল, কালোব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, পরে কালো পতাকাসহ শোক মিছিল। ২৪ জানুয়ারি দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল।

২২ জানুয়ারি ঢাকা নগরীতে এমন কোনো বাঙালি দেখিনি যার বুকে কালোব্যাজ নেই। বাড়িতে, অফিসে সর্বত্রই কালো পতাকা উড়ছে। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া ঘৃণা প্রকাশের এ প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল সর্বত্র। ২৩ জানুয়ারি, শহরের সব অলিগলি থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় মশাল মিছিল। সমগ্র ঢাকা পরিণত হয় মশালের নগরীতে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে লিখে বোঝানো যাবে না। ২৪ জানুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালিত হলো। সর্বত্র মানুষের একটাই প্রশ্ন, ‘শেখ মুজিব কবে মুক্তি পাবে?’ ‘কবে আগরতলা মামলা তুলে নেওয়া হবে?’ ঢাকায় এ ধরনের আলোচনাই চলছিল।

হরতালের পরও মিছিলের বিরাম নেই। সমগ্র বাংলাদেশ গণঅভ্যুত্থানের প্রবল বিস্ফোরণে প্রকম্পিত, অগ্নিগর্ভ। জনরোষ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখা যে কত কঠিন, সেদিন মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী, ইপিআর এবং পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে বিক্ষোভ দমনে। যত্রতত্র গুলি চালাতে থাকে। সে গুলিতেই শহীদদের তালিকায় যুক্ত হয় মতিউর, মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরও অনেক নাম। লক্ষ মানুষ নেমে আসে ঢাকার রাজপথে। মানুষের পুঞ্জীভূত ঘৃণা এমন ভয়ংকর ক্ষোভে পরিণত হয়, বিক্ষুব্ধ মানুষ ভয়াল গর্জন তুলে সরকারি ভবন ও সরকার সমর্থিত পত্রিকাগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয়।

‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘পয়গাম’ পত্রিকা অফিস ভস্মীভূত হয়। আগরতলা মামলার প্রধান বিচারপতি এস রহমান তার বাসভবন থেকে এক বস্ত্রে পালিয়ে যান। নবাব হাসান আসকারি, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য এনএ লস্কর এবং রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধকারী খাজা শাহাবুদ্দীনসহ আরও কয়েক মন্ত্রীর বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়। ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানের লাশ নিয়ে আমরা পল্টনে যাই। লক্ষ লক্ষ মানুষ পল্টনে সমবেত হয়।

জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। বিক্ষুব্ধ জনতা গভর্নর হাউজ আক্রমণ করতে চায়। বিনা মাইকে বক্তৃতা করে সংগ্রামী জনতাকে শান্ত করে মতিউরের লাশ নিয়ে পল্টন ময়দান থেকে গণমিছিল নিয়ে আমরা ইকবাল হলের মাঠে আসি। যে মাঠে এসেছিলেন সদ্য সন্তানহারা শহীদ মতিউরের পিতা জনাব আজহার আলী মল্লিক। তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে দুঃখ নাই। কিন্তু আমার ছেলের এই রক্ত যেন বৃথা না যায়।’ যখন ইকবাল হলে পৌঁছলাম তখনই রেডিওতে ঘোষণা করা হলো ঢাকা শহরে কারফিউ বলবতের কথা।

মতিউরের পকেটে নাম-ঠিকানাসহ এক টুকরো কাগজে লেখা ছিল, ‘মা-গো, মিছিলে যাচ্ছি। যদি ফিরে না আসি মা, মনে কোরো তোমার ছেলে বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছে। ইতি- মতিউর রহমান, ১০ম শ্রেণি, নবকুমার ইনস্টিটিউশন। পিতা- আজহার আলী মল্লিক, ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনি, মতিঝিল।’ কারফিউর মধ্যেই আমরা মতিউরের লাশ নিয়ে গেলাম ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনিতে। আমরা পিতা-মাতার আকুল আর্তনাদের আশঙ্কা করছিলাম।

কিন্তু মা শুধু আঁচলে চোখ মুছে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে দুঃখ নাই! আজ থেকে তুমি আমার ছেলে। মনে রেখো, যেজন্য আমার ছেলে রক্ত দিয়ে গেল, সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়।’ শহীদ মতিউরের পিতা ২০১৭-এর ১৭ জুলাই মৃত্যুবরণ করেছেন। মতিউরের কবরেই তিনি চিরনিদ্রায়শায়িত। তার কথা সবসময় মনে করি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সহযোগিতায় উত্তরায় তার জীবদ্দশায় একটি প্লট দেওয়া হয়। যেখানে ৬ তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করতেন।

ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণআন্দোলন-গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় গণঅভ্যুত্থান। কারফিউর মধ্যে একদিনও থেমে থাকেনি আমাদের সংগ্রাম। দেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি প্রশাসন বর্জন করেছে। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, সচিবালয় সর্বত্র প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য ধরনা দিতেন ইকবাল হলে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতাদের কাছে। কিছুদিনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে ইকবাল হল।

২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ১১ দফার প্রতি ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলাম। এরপর সান্ধ্য আইন প্রত্যাহৃত হলে ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ‘শপথ দিবস’ পালন করে।

শপথ দিবসে আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয় এবং আমরা ১০ জন ছাত্রনেতা ‘জীবনের বিনিময়ে হলেও ১১ দফা দাবি বাস্তবায়ন করব’, জাতির সামনে এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করার শপথ নিয়ে স্লোগান তুলি, ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো, শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’ আজ ভাবতে ভালো লাগে, ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি প্রিয়নেতাকে মুক্ত করে স্লোগানের প্রথম অংশ এবং ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয় অংশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছি।

তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

tofailahmed69@gmail.com

Updated: 25 January 2021